গতকাল পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় পেশ হলো ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের অন্তর্বর্তী বাজেট। বিধানসভার ভেতরে যখন একের পর এক জনমোহিনী প্রকল্পের ঘোষণা হচ্ছিল, তখন অর্থনীতির সাধারণ ছাত্র বা সচেতন নাগরিকের কপালে চিন্তার ভাঁজ গভীর হচ্ছিল। ৪.০৬ লক্ষ কোটি টাকার এই বাজেটে আপাতদৃষ্টিতে চমক অনেক, কিন্তু গভীরে তাকালে দেখা যাচ্ছে এক ভয়াবহ শূন্যতা। কর্মসংস্থান নেই, শিল্প নেই, উৎপাদনশীল সম্পদ নেই—আছে শুধু ঋণের বোঝা আর ভাতার রাজনীতি।
ঋণ করে ঘি খাওয়ার সংস্কৃতি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা ভারতের অন্যান্য বড় রাজ্যগুলোর তুলনায় অত্যন্ত শোচনীয়। রাজ্যের আয়ের একটা বিশাল অংশ চলে যায় পুরনো ঋণের সুদ মেটাতে। মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু বা গুজরাট যখন সেই টাকা পরিকাঠামো বা শিল্প করিডর তৈরিতে খরচ করছে, বাংলা তখন ঋণ নিচ্ছে দৈনন্দিন খরচ আর ভাতা চালানোর জন্য। অর্থনীতিতে একটা কথা আছে—ঋণ নিয়ে 'অ্যাসেট' বা সম্পদ তৈরি করলে তা লাভজনক, কিন্তু ঋণ নিয়ে যদি কেবল ভোগবিলাস বা দান-খয়রাত চলে, তবে তা সর্বনাশের লক্ষণ। এই বাজেট কার্যত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর এক বিশাল ঋণের বোঝা চাপিয়ে দিল।
শিল্প কোথায়? কাজ কোথায়? বাজেটে 'যুব সাথী' প্রকল্পের মাধ্যমে বেকার যুবক-যুবতীদের মাসে ১৫০০ টাকা দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাংলার যুবসমাজ কি সারা জীবন ১৫০০ টাকার ভাতাতেই বাঁচবে? রাজ্যে নতুন কোনো বড় শিল্প নেই, নেই কোনো আইটি হাব বা ম্যানুফ্যাকচারিং জোন। গুজরাট বা কর্ণাটকের জিডিপি গ্রোথ যেখানে রকেটের গতিতে এগোচ্ছে, সেখানে বাংলার গ্রোথ রেট ধুঁকছে। উৎপাদনশীলতা বা 'Productivity'-র নিরিখে বাংলা আজ তলানিতে।
আজকের যুবসমাজ চায় ২৫-৩০ হাজার টাকার সম্মানজনক চাকরি, ১৫০০ টাকার 'বেকার ভাতা' নয়। কিন্তু রাজ্য সরকার কাজের সুযোগ তৈরি না করে, ভাতা দিয়ে বেকারত্বকে কার্যত 'উপহার' হিসেবে পেশ করছে। এর ফলে মেধা পাচার হচ্ছে, আর যারা রাজ্যে থেকে যাচ্ছেন, তাদের কর্মক্ষমতা নষ্ট হচ্ছে।
খয়রাতি বনাম কর্মসংস্কৃতি বাজেটের অন্যতম বড় দিক হলো বিভিন্ন ভাতার পরিমাণ বৃদ্ধি। অবশ্যই সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য সাহায্যের প্রয়োজন আছে। কিন্তু যখন ঢালাওভাবে কর্মক্ষম মানুষকেও ভাতার আওতায় আনা হয়, তখন তা 'কর্মবিমুখতা' তৈরি করে। গ্রামবাংলায় আজ কৃষিকাজ বা ছোট শিল্পের জন্য শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না, কারণ ভাতার টাকায় অনেকের ন্যূনতম প্রয়োজন মিটে যাচ্ছে। এই 'ফ্রিবি কালচার' বা খয়রাতির রাজনীতি বাংলার মানুষের পরিশ্রম করার মানসিকতা বা 'Work Culture'-কে ধ্বংস করে দিচ্ছে। সরকার মানুষকে স্বাবলম্বী করার বদলে পরনির্ভরশীল করে তুলছে।
কেন্দ্রের দিকে তাকিয়ে থাকা আর নিজের দায় এড়ানো বাজেট বক্তৃতায় বা সরকারের বিভিন্ন বয়ানে বারবার কেন্দ্রের বঞ্চনার কথা বলা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাজ্য নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য কী করছে? রাজ্যের নিজস্ব আয় বাড়ানোর কোনো দিশা এই বাজেটে নেই। কেবল কেন্দ্রের অনুদান আর বাজার থেকে চড়া সুদে ঋণ—এটাই কি বাংলার অর্থনীতির মডেল?
উপসংহার ২০২৬-এর এই বাজেট হয়তো নির্বাচনের আগে ভোটব্যাঙ্ক সামলাতে কার্যকর হতে পারে, কিন্তু রাজ্যের অর্থনীতির জন্য এটি এক অশনি সংকেত। শিল্প নেই, চাকরি নেই, কেবল আছে ঋণের টাকায় কেনা সাময়িক স্বস্তি। এভাবে চলতে থাকলে বাংলা একদিন অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে পড়বে। সময় এসেছে প্রশ্ন করার—আমরা কি কেবল 'ভাতা' চাই, নাকি রাজ্যের প্রকৃত 'উন্নয়ন' চাই?
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন