শনিবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০২৫

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক: ঐতিহাসিক মৈত্রী বনাম বর্তমানের অকৃতজ্ঞতা ও মৌলবাদের আস্ফালন

ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক কেবল দুটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কূটনৈতিক সমীকরণ নয়—এই সম্পর্ক রক্ত, আত্মত্যাগ, ইতিহাস এবং পারস্পরিক নির্ভরতার ওপর গড়ে উঠেছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত যেভাবে বন্ধুর মতো নয়, নিজের ভাইয়ের মতো পাশে দাঁড়িয়েছিল, তা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। লক্ষ লক্ষ শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়া থেকে শুরু করে ভারতীয় সেনাবাহিনীর রক্তদান—সবই ছিল এক স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ দেখার লক্ষ্যে। যুদ্ধজয়ের পর ভারত সেখানে নিজের সেনা মোতায়েন রাখেনি, বরং সসম্মানে ফিরিয়ে এনে প্রমাণ করেছিল যে ভারতের লক্ষ্য ‘দখল’ নয়, ছিল ‘মুক্তি’।

অথচ আজ সেই ইতিহাসের পাতায় কালিমালিপ্ত করার এক ঘৃণ্য প্রচেষ্টা আমরা লক্ষ্য করছি।

ভারতের উদারতা বনাম বর্তমান বাস্তবতা অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক—উভয় ক্ষেত্রেই ভারত সবসময় ‘বড় ভাই’-এর মতো উদারতা দেখিয়েছে। ছিটমহল বিনিময় চুক্তির মাধ্যমে ভারত নিজের জমির মায়া ত্যাগ করে দীর্ঘমেয়াদী শান্তির স্বার্থে মানবিকতার নজির গড়েছে। বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যের সুবিধার্থে নিজের বন্দর ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে, যা তাদের অর্থনীতিকে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সাহায্য করেছে। এমনকি বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার চাবিকাঠিও অনেকাংশে ভারতের হাতে। ভারত থেকে খাদ্যদ্রব্য সরবরাহ বন্ধ হলে বাংলাদেশে মুদ্রাস্ফীতি যে পর্যায়ে পৌঁছাবে, তা সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তোলার জন্য যথেষ্ট।

অরাজকতা এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতা কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশের চিত্রটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সম্প্রতি হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে যে অরাজকতা সৃষ্টি হয়েছে, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও সংবাদমাধ্যমের অফিসে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে—তা এক ভয়াবহ ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে একজন সংখ্যালঘু হিন্দু যুবককে পিটিয়ে মেরে গাছে ঝুলিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা যে পৈশাচিক মানসিকতার পরিচয় দেয়, তা সভ্য সমাজে অকল্পনীয়।

এই পরিস্থিতির জন্য বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ব্যর্থতাও কম দায়ী নয়। প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার অভাব এবং দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকার ফলে দেশের মাটির সঙ্গে সংযোগহীনতা প্রকট হয়ে উঠছে। তিনি নির্বাচিত নন এবং নির্বাচন প্রক্রিয়া অকারণে বিলম্বিত করে চলেছেন। একটি গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় থাকলে হয়তো পরিস্থিতির মোকাবিলা অনেক বেশি দায়িত্বশীলভাবে করা সম্ভব হতো। কিন্তু বর্তমান শাসনে মৌলবাদীরা যে প্রশ্রয় পাচ্ছে, তা স্পষ্ট।

সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত ও ভারত-বিদ্বেষ সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হলো, কোনো প্রমাণ বা তদন্ত ছাড়াই ঢালাওভাবে ভারতকে দোষারোপ করার এক অন্ধ সংস্কৃতি তৈরি করা হয়েছে। ভারতীয় হাইকমিশনের দিকে মিছিল এবং হামলার চেষ্টা সেই বিদ্বেষেরই বহিঃপ্রকাশ।

সম্প্রতি এই বিদ্বেষ এক বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে। ভারতের ইতিহাসে যাকে ‘দখলদার’ বলা হয়, সেই বাবরের নাম করে ঢাকায় স্লোগান উঠছে।  ছাত্র শিবিরের কিছু নেতা স্লোগান দিয়েছেন—‘বাবরের পথ’ ধরে ভারতের সেভেন সিস্টার্স বা উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলিকে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হবে। এটি আর কেবল অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা নয়, এটি ভারতের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার প্রতি সরাসরি হুমকি।

উপসংহার ভারত সবসময়ই চেয়েছে বাংলাদেশ একটি স্থিতিশীল, সন্ত্রাসমুক্ত ও শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্র হোক। কারণ একটি অশান্ত বাংলাদেশ ভারতের পূর্ব সীমান্তের নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি। কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন, ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক একপাক্ষিক হতে পারে না। ইতিহাস সাক্ষী—সহযোগিতা দুই দেশকেই এগিয়ে নিয়ে যায়, আর অবিশ্বাস ও অকৃতজ্ঞতা ধ্বংস ডেকে আনে।

ভারত এখনো আশা করে বাংলাদেশে শুভবুদ্ধির উদয় হবে, তারা তাদের ভুল বুঝতে পারবে এবং হিংসার পথ ছেড়ে শান্তি ও উন্নয়নের পথে ফিরবে। কিন্তু ভারতের সার্বভৌমত্বের দিকে আঙুল তুললে বা ইতিহাস বিস্মৃত হলে তার ফল যে ভালো হবে না, এই বার্তাটিও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন